January 18, 2026, 7:07 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর। এই সফরকে বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। সফরের অর্জন নিয়ে চুলচেরা বিচার চলছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রথম সফরে বিনিয়োগসহ চীনের বিভিন্ন প্রস্তাবকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সফরের তৃতীয় দিনে চীনের প্রেসিডেন্ট, চীন সরকার ও সে দেশের বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ।
ড. ইউনূসের এই সফর কি বাস্তববাদী কূটনীতির দিকে বাংলাদেশের একটি পদক্ষেপ, না কি বাংলাদেশ ধীরে ধীরে চীনের কৌশলগত প্রভাব বলয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ছে, এ প্রশ্ন তুলেছেন দিল্লিভিত্তিক সংস্থা এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক ঋষি গুপ্তা। গত মঙ্গলবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টে এক কলামে তিনি লিখেছেন, চীন প্রায়ই এশিয়ার দেশগুলোর সেসব নেতাদের নিজ দেশে আমন্ত্রণ জানায়, যারা আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে বা তাদের দেশকে দীর্ঘদিনের মিত্র থেকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে চায়। ভারতীয় এই বিশ্লেষক লিখেছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ভারতমুখী ছিল। ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকার এখন সেখান থেকে সরে অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক যখন নাজুক, তখন চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দিতে পারে এবং তা ভারতের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিতে পারে।
টানা দেড় দশক বাংলাদেশ শাসন করা হাসিনার বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ, তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছিলেন। অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট ভারতে গিয়েই আশ্রয় নেন তিনি। অভ্যুত্থানের পরপরই ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বতী সরকার গঠিত হয়। তারপর ভারতের সাথে শীতল সম্পর্ক এখনো উষ্ণতার দিকে গড়ায়নি। প্রতিবেশী দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে এখনো কোনো বৈঠক হয়নি ড. ইউনূসের। বিপরীতে ভারতের বৈরী প্রতিবেশী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে দুবার বৈঠক হয়েছে। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা চীনের জন্য একটি সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। চীন এই পরিস্থিতি কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন খাতে (বাণিজ্য, চিকিৎসা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি) সম্পর্ক আরো মজবুত করার কাজ করছে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় ৩০টি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশের বিশেষ চীনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে, যা প্রধান উপদেষ্টা বেসরকারি খাতকে বাংলাদেশের উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগ করতে আহ্বান জানানোর পর এসেছে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ে একটি চুক্তি এবং আটটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার চার দিনের চীন সফরের গতকাল শুক্রবার তৃতীয় দিনে দুই দেশের মধ্যে এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও স্মারকগুলো সই হয়। সমঝোতা স্মারকগুলোর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের কালজয়ী সাহিত্য ও শিল্পকর্মের অনুবাদ ও সৃজন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও খবর আদান-প্রদান, গণমাধ্যম, ক্রীড়া এবং স্বাস্থ্য খাতে বিনিময় সহযোগিতা। এর পাশাপাশি, প্রধান উপদেষ্টার দ্বিপাক্ষিক চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে পাঁচ বিষয়ে সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়েছে। বাংলাদেশি কর্মকর্তারা এবং ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের বরাত দিয়ে শুক্রবার সরকারের ‘চিফ অ্যাডভাইজর জিওবি’ ফেসবুক পেজ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ফেসবুকে শেয়ার করা তথ্যে বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা চীনের বেসরকারি উদ্যোগগুলোকে বাংলাদেশে উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানানোর পর প্রায় ৩০টি চীনা কোম্পানি একচেটিয়া চীনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়, চীন মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ প্রকল্পে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার, চীনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা হিসেবে আরো ১৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়ার পরিকল্পনা করেছে। বাকি অর্থ অনুদান এবং অন্যান্য ধরনের ঋণ হিসেবে আসবে।
২.১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ-ঋণ-অনুদানের চীনের প্রতিশ্রুতি/
চীন মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ প্রকল্পে আরো প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ, চীনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা হিসেবে আরো ১৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ প্রদানের পরিকল্পনা করেছে। বাকি অর্থ অনুদান ও অন্যান্য ঋণ সহায়তা হিসেবে আসবে। প্রধান উপদেষ্টার চার দিনের চীন সফরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সফর’।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, এই সফর বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সময় ড. ইউনূস চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বাংলাদেশে চীনা বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের জন্য ‘সবুজ সঙ্কেত’ দেয়ার অনুরোধ জানান। প্রেসিডেন্ট শি নিশ্চিত করেন যে, চীনা কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন কেন্দ্র বৈচিত্র্যময় করতে চাইলে বাংলাদেশে স্থানান্তরের জন্য তিনি উৎসাহিত করবেন, জানান আশিক চৌধুরী। তিনি বলেন, এই সফর অনেক চীনা কোম্পানিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে রাজি করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি কেবল সময়ের ব্যাপার।
শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় চীনকে জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান
শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় চীনকে আরো জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল শুক্রবার সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তিনি এই আহ্বান জানান। বৈঠকে উভয় নেতা দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। প্রফেসর ইউনূস তার বক্তব্যের শুরুতে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। বাংলাদেশে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই অভ্যুত্থান ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের পথ সুগম করেছে। চীনের সঙ্গে তার দীর্ঘ সম্পর্কের কথা স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তিনি সেখানে গ্রামীণ ব্যাংক ও সামাজিক ব্যবসার প্রচলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বৈঠকের সময় তিনি রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে আলোচনা করেন এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনে চীনের শক্তিশালী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজ নিজ পক্ষের নেতৃত্ব দেন। ড. ইউনূস গতকাল বেইজিংয়ের দ্য প্রেসিডেন্সিয়ালে চীনা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি বিনিয়োগ সংলাপে অংশ নিয়েছেন। এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সম্পর্কে চীনা বিনিয়োগকারীদের ধারণা প্রদান এবং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। প্রধান উপদেষ্টা একই ভেন্যুতে তিনটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন, যার বিষয়বস্তু হলোÑ টেকসই অবকাঠামো ও জ্বালানি বিনিয়োগ, বাংলাদেশ- উৎপাদন ও বাজারের সুযোগ এবং সামাজিক ব্যবসা, যুব উদ্যোক্তা ও থ্রি জিরো বিশ্বের ভবিষ্যৎ। বৈঠকে তিনি বিভিন্ন কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সামাজিক ব্যবসা ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ, চীনের স্বনামধন্য কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। অধ্যাপক ইউনূস চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের আয়োজনে এক নৈশভোজেও অংশ নেবেন।
চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান
বাংলাদেশের ব্যবসার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি চীনা বিয়োগকারীদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা (চীনা বিনিয়োগকারীরা) বাংলাদেশের ব্যবসার সম্ভাবনার সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন। বেইজিংয়ের ‘দ্য প্রেসিডেন্সিয়াল’-এ চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে এক বিনিয়োগ সংলাপে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
সরকারপ্রধান বলেন, বাংলাদেশ চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। এছাড়া, বাংলাদেশ এমন একটি চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে যেখানে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রসহ বড় বড় নদীগুলো প্রবাহিত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের কথা উল্লেখ করে তিনি বাণিজ্য ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সমুদ্রের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। প্রফেসর ইউনূস বলেন, নেপাল ও ভুটান স্থলবেষ্টিত দেশ, যাদের কোনো সমুদ্র নেই। ভারতের সাতটি উত্তর-পূর্ব রাজ্যও স্থলবেষ্টিত।